শনিবার ১৩ জুন ২০২৬
Online Edition

পঞ্চগড়ের চা-চাষিদের বিড়ম্বনা

উত্তর জনপদের পঞ্চগড়ে চা-চাষ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। এখানকার মাটি চা-চাষের উপযোগী হওয়ায় গুণগত মানেও চা বেশ ভালো। এবার আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় বাম্পার ফলন হয়েছে বলে দৈনিক ইত্তেফাকের রিপোর্টে প্রকাশ। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, চাষীরা তাদের উৎপাদন খরচও পাচ্ছে না বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। অর্থাৎ চাষীরা সব ফসলেই ঠকছেন। এ যেন তাদের নিয়তি। ধান, পাট, আখ, ভুট্টা যে ফসলই চাষীরা উৎপাদন করুন না কেন, তাদের ঠকানোর জন্য সিন্ডিকেট ওঁৎ পেতে থাকে। সিন্ডিকেট মানে দল বা গোষ্ঠী। অর্থাৎ ব্যবসায়ীরা দলবেঁধে চাষীদের উৎপাদিত পণ্যের মূল্য কম দেন। ধান-পাট থেকে শুরু করে চা পর্যন্ত নানা অপকৌশলে কৃষকদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়ে তারা অর্থের পাহাড় গড়ছেন। অথচ কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য না পেয়ে ঋণের কিস্তি যেমন দিতে পারেন না, তেমনই পরিবার পরিজন নিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খান প্রতিবছরই। পঞ্চগড়ের চা-চাষীরা চা-উৎপাদনে যথেষ্ট অবদান রাখতে সক্ষম হলেও একশ্রেণির ব্যবসায়ী তাদের ঠকিয়ে ক্রমাগত নিরুৎসাহিত করছেন। ফলে এলাকায় পুরোদমে শুরুর আগেই চা-চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন পঞ্চগড়ের চাষীরা। উল্লেখ্য, এলাকাটি ভারতের দার্জিলিংয়ের কাছাকাছি হওয়াতে এখানকার কঙ্করময় মাটি চা-চাষের জন্য উপযোগী। দার্জিলিংয়ের চায়ের যেমন বিশ্বজোড়া খ্যাতি আছে, তেমনই পঞ্চগড়ের চাও খ্যাতি অর্জন করতে পারে অনায়াসেই। কিন্তু ব্যবসায়ীদের অতিমুনাফার লোভ চা-চাষীদের আর যেন এগোতে দিতে চায় না। 

পঞ্চগড়ে ৭টি চা-কারখানা স্থাপিত হয়েছে। চাষীরা এসব কারখানায় কাঁচা চা-পাতা সরবরাহ করেন। প্রতিকেজি চা-পাতা ২৪ টাকা দরে চাষীদের কাছ থেকে নেবার কথা থাকলেও নেয়া হয় ২০ টাকায়। তাও আবার একজন চাষীর কাছ থেকে একবার চা-পাতা নেয়া হলে ১০ দিন না হলে আর নেয়া হয় না। ফলে অনেকের পাতা বাগানেই নষ্ট হয়ে যায়। অনেক চা-চাষী অভিযোগ করেছেন, পাতার অর্ধেক দামও এখন দেয়া হয় না। এব্যাপারে চা-চাষীরা প্রতিবাদ করেছেন। তারা সম্প্রতি চৌরঙ্গি এলাকা থেকে ডিসি অফিস পর্যন্ত এক কিলোমিটার সড়কে চা-পাতা ছিটিয়ে বিক্ষোভ করেছেন। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ এব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবার আশ্বাস দিয়েছেন। উল্লেখ্য, চাষীদের পরামর্শ দেবারও কেউ নেই। ফলে যে যেভাবে পারছেন চা-বাগান করছেন। এতে চায়ের কাক্সিক্ষত গুণগত মান পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ সঠিক পরামর্শ পেলে দার্জিলিংয়ের মতো মানসম্পন্ন চা-উৎপাদন করা সম্ভব পঞ্চগড়ে। কৃষকরা জানিয়েছেন, এ অঞ্চলে এখন যে পরিমাণ চা-পাতা উৎপন্ন হয় তার অর্ধেকও নিতে পারে না কারখানাগুলো। তাই চা-পাতা প্রক্রিয়াকরণ কারখানা আরও অন্তত ৭টি প্রয়োজন। এব্যাপারে চা-ব্যবসায়ীসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এখনই ভেবে দেখা দরকার। শুধু কর্তৃপক্ষের অবহেলা ও অমনোযোগের ফলে চা-শিল্পের মতো অর্থকরী শিল্প মার খাবে তা কোনওক্রমেই মেনে নেয়া যায় না। তাই এলাকার চা-শিল্প রক্ষায় এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে। অভিযোগ পাওয়া গেছে, কারখানা থেকে পাতা তোলার স্লিপ ইস্যু করা হলেও মৌখিকভাবে চা-পাতা কারখানায় আনতে নিষেধ করে দেয়া হয় রহস্যজনকভাবে। তাহলে বাগানের চা-পাতার কী হবে? অনেকে মনে করছেন, চা-পাতা এখন গরু-ছাগলকেও খাইয়ে শেষ করা যাবে না। অর্থকরী চায়ের এ দুর্দশা সত্যিই দুর্ভাগ্যজনক।

যাহোক, আমাদের অর্থনীতির মেরুদণ্ড শক্ত করতে এই চা, পাট ও পোশাকের মতই অবদান রাখতে সক্ষম। অবশ্য চা-শিল্প আমাদের পোশাকের চেয়ে প্রাচীন এবং ঐতিহ্যবাহী। যেখানে চা-শিল্পের উত্তরোত্তর উন্নতি হবার কথা, সেখানে শুধু অবহেলা ও অমনোযোগের কারণে তা রুগ্নশিল্পে পরিণত হতে যাচ্ছে। পঞ্চগড়ের চা-শিল্প অঞ্চলটি এখন তৃতীয় স্থানে অবস্থান করছে। এর সঠিক যতœ ও পরিচর্যা করলে এটির অবস্থানগত উন্নয়নও সম্ভব। কারণ অঞ্চলটি ভারতের বিশ্বখ্যাত চা-শিল্প অঞ্চল দার্জিলিংয়ের সন্নিকটে। মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থানের দিক থেকে। পরিবেশ এবং ভূপ্রকৃতিও প্রায় একই। কাজেই দেশের তৃতীয় চা অঞ্চলটি যাতে মানসম্পন্ন এবং আমাদের অর্থনীতিতে কাক্সিক্ষত অবদান রাখতে সক্ষম হয় সে ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের এখনই মনোযোগ দিতে হবে। আর চা-চাষীরা যেন বিড়ম্বনায় না পড়েন, ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত না হন সে ব্যাপারেও জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ